07 October, 2026 | Wednesday
অনলাইন সংস্করণ • ই-পেপার প্রিন্ট
dainiksomoybarta.com
চা বাগানের সবুজে ঘেরা জনপদ। চারদিকে উৎসবের আমেজ। মাঠজুড়ে মানুষের ঢল। কারও পরনে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, কারও হাতে বাদ্যযন্ত্র। ঢোলের তালে তালে চলছে নৃত্য। কখনও গান, কখনও লোককথা। আবার কখনও ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের ছন্দে মুখর পুরো পরিবেশ। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও হাজার বছরের শেকড়ের গল্প যেন নতুন করে বলছিলেন চা বাগানের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ।এভাবেই ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দঘন পরিবেশে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার নালুয়া চা বাগানে অনুষ্ঠিত হয়েছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব ‘কারাম পূজা’।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিনব্যাপী নালুয়া চা বাগানের ফুটবল মাঠে আয়োজিত এ উৎসবে সমবেত হন কয়েক হাজার মানুষ। আয়োজকদের হিসাবে, উৎসবে প্রায় তিন থেকে চার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।

কারাম উৎসব শুধু পূজা-অর্চনার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না।এটি পরিণত হয় চা বাগানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মিলন, আনন্দ, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরার এক বৃহৎ আয়োজনে।
নালুয়া চা বাগানের আদিবাসীদের আয়োজনে এবং বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সার্বিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত উৎসবে সিলেট, মৌলভীবাজার, সাতগাঁও, সুরমা, দেওন্দী, লালচান্দ, চান্দপুর, চণ্ডিছড়া, চাকলাউ, আমু ও নালুয়া চা বাগানসহ বিভিন্ন বাগান থেকে সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়।
উরাঁও, মুন্ডা, সাঁওতাল, খাড়িয়া, বাড়াইক, তাঁতী, কর্মকার, ভূমিজ, তুরিয়া, মাহালীসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের ১৪ থেকে ১৫টি নৃত্য ও সাংস্কৃতিক দল উৎসবে অংশ নেয়। একের পর এক দল মঞ্চে উঠে নাচ ও গান পরিবেশন করে। তাদের পরিবেশনায় ফুটে ওঠে নিজস্ব ভাষা, লোকজ ঐতিহ্য, জীবনযাপন ও সংস্কৃতির নানা রং।
কারাম মূলত একটি গাছকে কেন্দ্র করে পালিত ধর্মীয় উৎসব।আদিবাসী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে কারাম গাছ পবিত্রতার প্রতীক। একই সঙ্গে এটি মঙ্গল, কল্যাণ ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।
কারাম পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই ভাই ধর্মা ও কর্মার কাহিনি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ধর্মা ধর্ম ও ন্যায়নীতির পথে চলায় নানা বিপদ থেকে রক্ষা পান। অন্যদিকে কর্মা ধর্মীয় বিধান ও নীতি অনুসরণ না করায় ক্ষতির মুখে পড়েন। এই কাহিনির মধ্য দিয়ে সৎপথে চলা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং ন্যায়নীতির প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা তুলে ধরা হয়।
উৎসব উপলক্ষে কারাম ডাল অস্থায়ী মণ্ডপে স্থাপন করা হয়। এরপর চলে পূজা-অর্চনা, নাচ-গান ও লোককথা বলার আয়োজন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এসব আচার-অনুষ্ঠানই কারাম উৎসবকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
উৎসব শেষে পরদিন কারাম ডাল উঠিয়ে নেওয়ারও রীতি রয়েছে। এ সময় গ্রামের তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ নেচে-গেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুকুরে কারাম ডাল বিসর্জন দেন।নেচে-গেয়ে কারাম উৎসবের উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ।বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের গোপনীয় শাখা ও জেএম শাখার সহকারী কমিশনার পৃথ্বীন্দ্র চাকমা, চুনারুঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তৌফিক আনোয়ার, আহমদাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন পলাশ, নালুয়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক তারিফ আহমেদ, সহকারী ব্যবস্থাপক অরূপ চাকমা, সাব্বির আহমেদ, আব্দুর রউফ, আসফাক নাসের তৌকির, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক নৃপেন পাল, সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান খায়রুন আক্তার এবং সিলেট মহানগর হাসপাতালের পরিচালক মাসুদ আহমেদ।এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন চা বাগানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন: dainiksomoybarta.com
© 2026 দৈনিক সময় বার্তা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।